সৌরশক্তি (Solar energy)কি কোনো কিভাবে আবিষ্কার হলো।

 সৌরশক্তি


সূর্যরশ্মির ভয়ঙ্কর শক্তির কথা বােধ হয় প্রথমে মহাত্মা আর্কিমিদিসই টেরপেয়েছিলেন।


আর্কিমিদিস ছিলেন সাইরাকিউসের রাজার বন্ধু। একবার রােমানরা বিশাল এক নৌবহর সজ্জিত করে এগিয়ে এসেছিল সাইরাকিউস আক্রমণ করতে। তাদের প্রতিহত করার সাধ্য সাইরাকিউসের রাজার ছিল না। তাই ডেকে পাঠিয়েছিলেন বিজ্ঞানী বন্ধু আর্কিমিদিসকে। জানিয়েছিলেন রাজ্যের আসন্ন বিপদের কথা।


আর্কিমিদিস অনেক চিন্তা করে কয়েকটি ষড়ভূজাকৃতি দর্পণ তৈরি করেছিলেন। যখন রােমান রণতরীগুলি এগিয়ে এসে নােঙর করলাে তখন আর্কিমিদিস দর্পণগুলি হাতে নিয়ে এগিয়ে গেলেন। নিদাঘের নির্মেঘ মধ্যাহ আকাশে তখন দ্বাদশ সূর্যের দীপ্তি। আর্কিমিদিস দর্পণের সাহায্যে সূর্যরশ্মিকে কেন্দ্রীভূত করে প্রতিফলিত করলেন রণতরীগুলির পালের উপর। অকস্মাৎ দাউ দাউ করে জ্বলে উঠলাে পাল। বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল রােমান বাহিনী। অধিকাংশ রণতরী ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়ে নিমজ্জিত হলাে সাগরে।


কাহিনীটি, ২১৫ খ্রীষ্টপূর্বাব্দের। ঘটনাটি যদি সত্য হয় তাহলে বুঝতে হবে আর্কিমিদিসই প্রথম সৌরশক্তিকে মানুষের কাজে নিয়ােগ করেছিলেন। যদিও কাজটি ছিল ধ্বংসাত্মক।


আর্কিমিদিসের অনেক পরে ৬১৪ খ্রীষ্টাব্দে প্রােকাস নামে কনস্টান্টিনােপলের এক বিজ্ঞানীও উপরােক্ত পদ্ধতিতে বিদেশী রণতরীগুলিকে ধ্বংস করেছিলেন। তবে সূর্যরশ্মি থেকে অগ্নিউৎপাদন পদ্ধতি বেশ পুরাতন। কথিত আছে, এথেন্সবাসীরা তাঁদের আরাধ্যাদেবী ভেস্টার পূজার জন্য পবিত্র অগ্নিশিখার সৃষ্টি করতেন মসৃণ সােনার পাতে সূর্যরশ্মিকে কেন্দ্রীভূত করে। তবে এসব অতি পুরাতন দিনের কথা। 


তেল এবং কয়লার বিকল্প হিসাবে পরমাণুশক্তিকে মানুষ এখন ব্যবহার করছে। পরমাণুশক্তির উৎস হচ্ছে ইউরেনিয়াম নামক তেজস্ক্রিয় ধাতুটি। কিন্তু ইউরেনিয়ামের ভান্ডারও অফুরন্ত নয়। ব্যবহার করতে করতে মানুষ ওকেও শেষ করে ফেলবে। তাহলে ভবিষ্যতে মানুষ কি করবে? মানব সভ্যতার জয়যাত্রা কি সম্পূর্ণরূপে প্রতিহত হয়ে যাবে?


বিজ্ঞানীরা মনে করেন, মানবসভ্যতার অগ্রগতিকে রােধ করে এমন সাধ্য কার? কয়লা, পেট্রোলিয়াম ইউরেনিয়াম প্রভৃতি তেজস্ক্রিয় ধাতুর ভান্ডার নিঃশেষিত হয়ে যেতে পারে, কিন্তু সূর্য আকাশ থেকে যাবে কোথায়। তার যে অফুরন্ত শক্তি, কণামাত্র ব্যবহার করার উপায় উদ্ভাবন করতে পারলেই ভবিষ্যতে সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। তারা হিসেব করে জানিয়েছেন, প্রতি ১০০ ফুট জায়গায় যেটুকু সৌরশক্তি এসে পড়ে তার পরিমাণ একলক্ষ কিলাে ক্যালরি। (ক্যালরি তাপশক্তির একক। এককিলাে ক্যালরি=এক হাজার ক্যালরি।) শীতপ্রধান দেশ অপেক্ষা গ্রীষ্মপ্রধান দেশে এই শক্তির পরিমাণ আরও বেশী। যদি স্বল্প ব্যয়ে সৌরশক্তিকে সংগ্রহ করা যায়, তাহরে কয়লা, খনিজ তৈল, ইউরেনিয়াম প্রভৃতি তেজষিক্রয় ধাতু প্রভৃতি পৃথিবী থেকে নিঃশেষ হয়ে গেলেও কোন অসুবিধা হবে না।


অর্ধশতাব্দী ধরে বিজ্ঞানীরা এ বিষয়ে অনেক চিন্তা করে এসেছেন। ইতিমধ্যে কতকগুলি পদ্ধতিও তাঁদের কৃপায় আবিষ্কৃত হয়েছে। সেই পদ্ধতিগুলির কয়েকটি সংক্ষেপে বর্ণনা করা হলাে।


(১) বাসগৃহকে শীতের দিনে গরম রাখার পদ্ধতি। অনেকগুলি পদ্ধতির মধ্যে সবচেয়ে সহজতম এবং বায়বহুল নয় এমন পদ্ধতি হলাে, সৌরশক্তিকে সঞ্চয় করার জন্য সােডিয়াম সালফেট , ক্যালসিয়াম ক্লোরাইড প্রভৃতির টুকরাকে অ্যালুমিনিয়ামের তৈরি একটি পাত্রে আবদ্ধ রাখা হয়। পাত্রটিকে বলা হয়


“সৌরশক্তির সংগ্রাহক” । পাত্রটির মুখ ঢাকা থাকে স্বচ্ছ কাচের পাত এবং অভ্যন্তরে থাকে কয়েক সারি কালাে কাচের পাত। কালাে পদার্থ তাপ শােষণ করার কাজে বিশেষ উপযােগী বলেই সংগ্রাহকে কালাে কাচের পাত ব্যবহার করা হয়। সূর্যরশ্মি সংগ্রাহকের মুখের ঢাকনার ভেতর দিয়ে কাচের পাতের উপর পড়লেই উত্তপ্ত হয়। পাত্রের মধ্যে নালীপথ থাকে। বাসগৃহে শীতল বায়ু সেই নালীপথে প্রবেশ করে উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। তারপর সেই উত্তপ্তবায়ুকে বাসগৃহের বিভিন্ন গ্রকোষ্ঠে পরিচালনা করার ব্যবস্থা থাকে। এইভাবে ক্রমাগত পরিচালনা করা এবং সংগ্রাহক প্রকোষ্ঠে পুনরায় প্রেরণ করার ফলে বাসগৃহ উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।


(২) রান্নার কাজে সৌর উনান। একটি বিশেষ ধরণের তাপঅন্তরক ও বায়ুনিরােধক বাক্সের মুখ স্বচ্ছ কাচের ঢাকনা দিয়ে ঢেকে রাখা হয়। বাক্সের ভেতরের দেওয়ালে থাকে গাঢ় কালাে প্রলেপ। অনেক সময় অবতল দর্পণের সাহায্যে সূর্যকিরণকে কেন্দ্রীভূত করে বাক্সের উপর ফেলা হয়।


সুখের কথা, এই যন্ত্রটি আবিষ্কার করেছে ভারতবর্ষের "ন্যাশনাল ফিজিক্যাল ল্যাবরেটরি"। ঐ একই পদ্ধতিতে ইসরায়েল তৈরি করেছে সৌর জলাশয়। তাঁরা সূর্যরশ্মিকে সৌর জলাশয়ে সঞ্চিত করে তাকে রূপান্তরিত করছেন. বাষ্পীয় শক্তিতে এবং বৈদ্যুতিক শক্তিতে।


(৩) সূর্যরশ্মিকে উত্তল লেন্সের দ্বারা কেন্দ্রীভূত করে অতি অল্প জায়গায় প্রায় তিন হাজার ডিগ্রী সেন্টিগ্রেডের মত তাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে এবং তাতে এই উপায়েই তাপ উৎপন্ন করার ব্যবস্থা থাকে।


(৪) আমরা জানি, তাপশক্তি থেকে সরাসরিভাবে বিদ্যুৎশক্তি উৎপন্ন করা যায়। দুটি ভিন্ন ধাতুর তারের দুটি প্রান্ত জোড়া লাগিয়ে সেই জোড়া দেওয়া স্থানটিকে বিভিন্ন উষ্ণতায় গরম করলে তারের প্রান্তদ্বয়ে তড়িচ্চালক বলের তারতম্য ঘটে বলে একপ্রান্ত থেকে অন্য প্রান্ত পর্যন্ত তড়িৎপ্রবাহ পরিচালিত হয়। এই প্রক্রিয়ায় উৎপন্ন তড়িৎকে বলা হয় থার্মো-ইলেকট্রিসিটি। থার্মো ইলেটিসিটির জন্য ধাতব তারগুলির প্রান্তম্বয়কে সূর্যরশ্মির দ্বারা গরম করার পদ্ধতি উদ্ভাবিত হয়েছে।


(৫) সূর্যরশ্মিকে কাজে লাগিয়ে এক রকমের বিদ্যুৎকোষও তৈরী করা হচ্ছে। এই জাতীয় কোষের নাম “ফটোগ্যালভানিক সেল"।


(৬) সৌরশক্তিকে কাজে লাগিয়ে সমুদ্রের লবণাক্ত পানিকে পাতিত করার প্রচেষ্টা সবদেশেই শুরু হয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিজ্ঞানীরাই এ বিষয়ে অগ্রণী। বেশ কিছুদূর তাঁরা এগিয়েও গেছেন। পদ্ধতিটি কার্যকর হলে পানীয় পানি  সরবরাহের ব্যবস্থা খুব সহজ হবে।


(৭) বয়লারের পানিকে বা্পীূত করে সেই বা্পীশক্তিকে ব্যবহার করা হয় বিভিন্ন কলকারখানায়। পানিকে বাস্পীতৃত করতে তাই প্রয়ােজন হর প্রচুর জ্বালানী। বিশেষত কয়লাকেই জ্বালানী হিসাবে ব্যবহার করা হয়। এই জ্বালানীর সমস্যা সমাধানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিজ্ঞানীরা এক ধরণের সৌরযন্ত্রের আবিষ্কার করেছে। ঐ যন্ত্রটির দ্বারা সূর্যরশ্মির সাহাযযে তাঁরা বয়লারের পানিকে বাষ্পীভূত করছেন। এক বিশেষ ধরণের বড় দর্পণ ছাড়া এই যন্ত্রের অন্য কোন উল্লেখযােগ্য অংশ নেই। আমাদের দেশে এই ব্যবস্থা অবলম্বন করলে প্রচুর কয়লার সাশ্রয় হতাে।


(৮) মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র মানুষের প্রয়ােজনীয় প্রােটিন ও শ্লেহজাতীয় খাদ্য উৎপাদনের নিমিত্ত এখন সৌরশক্তির সাহায্য গ্রহণ করছে। এই উদ্দেশ্যে তারা চাষ করছে ক্লোরেলা নামক এক জাতীয় শ্যাওলা। ওদের বিশেষ বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, ওরা তাড়াতাড়ি বংশ বিস্তার করে এবং অপরাপর উদ্ভিদের তুলনায় বাড়েও দ্রুত। ক্লোরেলার আর একটি বৈশিষ্ট্য, ওরা প্রােটিন ও স্নেহজাতীয় পদার্থে ভয়ানক সমৃদ্ধ। খাদ্য হিসাবে ক্লোরেলা তাই অত্যন্ত মূল্যবান।


মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বড় বড় জলাভূমিতে সৌরশক্তির সঞ্চয়ন করে ক্লোরেলার চাষ করছে। খাদ্যসমস্যা সমাধানে এটি একটি উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ।


সৌরশক্তিকে কাজে লাগাবার আরও বহু পদ্ধতি আবিষ্কৃত হয়েছে। পৃথিবীর প্রত্যেকটি দেশ এই উদ্দেশ্যে আজ গবেষণারত। বিজ্ঞানীদের গবেষণার ফলে হয়ত একবিংশ শতাব্দীতেই সৌরশক্তি ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হবে। সেদিন মানুষ কয়লা ও পেট্রোলিয়ামের দিকে বড় একটা নজর দেবে না। বর্তমানে অনেক পদ্ধতিই আবিষ্কৃত হয়েছে। কিন্তু ব্যয়বাহুল্যের জন্য জনপ্রিয় হচ্ছে না। অল্প ব্যয়ে যেদিন মানুষ সৌরশক্তিকে উৎপন্ন করতে সমর্থ হবে, সেদিন অবশ্যই পৃথিবীর বুকে এক নতুন যুগের সূচনা হবে। ভারতের বহু গবেষণাগারেই এই নিয়ে গবেষণা হচ্ছে। যদিও মার্কিন বিজ্ঞানীরাএ বিষয়ে অনেকখানি এগিয়ে গেছেন। বিজ্ঞানীদের প্রচেষ্টার চন্দ্রপৃষ্ঠে যাতায়াতের সুবিধা এবং সেখানে উপনিবেশ গড়ে তােলা সম্ভব হলে এ কাজটা আরও সহজ হবে। হয়ত একদিন দেখা যাবে, পৃথিবীর থামালি ইলেকট্রিসিটির প্রধান ঘাটি চন্দ্র। সেখান থেকে পৃথিবীর সর্বত্রই সরবরাহ করা হচ্ছে বিদ্যুৎ। লােডসেডিং আর হচ্ছে না। কবে আসবে সেই দিন। আজকের দিনের তরুণ যারা-তারাই প্রশ্নটির উত্তর দেবে নিশ্চয়।


Post a Comment

Previous Post Next Post