কাঠের মন্ড থেকে কাগজ (Paper from wood pulp)কি কোনো কিভাবে আবিষ্কার হলো

 কাঠের মন্ড থেকে কাগজ


আমেরিকার গৃহযুদ্ধের সময় এক গবেষণা পাগল মার্কিন রসায়নবিদ বাধ্য হয়ে যুদ্ধে যােগদান করেছিলেন। নাম তাঁর বেঞ্জামিন ট্রিলঘুম্যান।


যুদ্ধ শেষ হলাে ১৮৬৫ খ্রীষ্টাব্দে। ঘরে ফিরলেন টিলঘম্যান। কিন্তু গবেষণার নেশা এত প্রবল ছিল যে, যুদ্ধ থেকে ফিরেই শুরু করেছিলেন গবেষণা। আগে থেকেই ঘরে একটা ছােট্ট ল্যাবােরেটারি তৈরি করে নিয়েছিলেন, তাই গবেষণার কোন অসুবিধা হলাে না। অপরদিকে যুদ্ধক্ষেত্রগুলােতে ঘুরতে ঘুরতে তাঁর যেন অবসাদ এসেছিল। তাই তিনি নির্জনতাকেই বেছে নিলেন। অনেকটা উদ্দেশ্যবিহীনভাবে রাসায়নিক পদার্থগুলাে একটিকে অন্যটির সাথে মিশিয়ে লক্ষ্য করতেন কোন পরিবর্তন আসে কিনা।



ট্রিলঘুম্যানের এক ভাই ছিলেন। নাম তার রিচার্ড। রিচার্ডও এককালে রসায়ন নিয়ে পড়াশােনা করেছিলেন। কিন্তু গবেষণার দিকে তাঁর তেমন আগ্রহ ছিল না। তিনি ছিলেন বেশ আমুদে এবং দাদার প্রতি শ্রদ্ধাও ছিল যথেষ্ট। তাই দাদার ল্যাবরেটরিতে মাঝে মাঝে ছুটে আসতেন আর জুড়ে দিতেন গল্প। রিচার্ডকে দেখলে হাতের কাজ ফেলে রেখে মুখােমুখি হতেন।


সেদিন সন্ধ্যায় ট্রিলম্যান একটা কাচের পাত্রে সালফিউরাস অ্যাসিডের সঙ্গে একটু একটু করে চুন মেশাচ্ছিলেন এবং সরু একটা কাঠি দিয়ে নাড়ানাড়ি করছিলেন। ঠিক সেই সময় রিচার্ড এসে হাজির। ট্রিলঘম্যান খুশি হয়ে ভাইয়ের দিকে ফিরে বসলেন। কাচের পাত্রে পড়ে রইল সালফিউরাস অ্যাসিডে গােলা চুন এবং কাঠিটা।


গল্প করতে করতে ট্রিলঘুম্যান ভুলে গেলেন তাঁর পরীক্ষার কথা। এক সময় ঘরের ভেতর থেকে খাওয়ার ডাক এলা। ভাই-র সাথে সমানে গল্প করতে করতে ট্রিলম্যান বসে গেলেন খাওয়ার টেবিলে। এবার ট্রিলঘুম্যানের স্ত্রীও যােগ দিলেন গল্পে।


গল্পে গল্পে রাত হলাে। ট্রিলঘুম্যান আর ল্যারোরেটারিতে ঢুকলেন না। সােজা বিছনায় শুয়ে পড়লেন।


পরদিন সকালে কাচপাত্রটাকে পরিষ্কার করতে গিয়ে অবাক হলেন ট্রিলম্যান। এখানে থকথকে মন্ড এলাে কেমন করে? গতকালের কথা ভাবলেন মনে মনে এবং মন্ডটার সম্বন্ধে চিন্তা ভাবনা করলেন। এক সময় বুঝতে পারলেন, সালফিউরাস অ্যাসিড, চুন আর সেই নাড়াচাড়া করার কাঠিটা-সব মিলে তৈরি হয়ে যায়।


যে সময়কার কথা বলা হচ্ছে, সে সময় কাগজ সহজলভ্য ছিল না। হাতে তৈরি কাগজের প্রচলন ছিল এবং সে কাগজ তৈরি হতাে ছেঁড়া কাপড় ইত্যাদির মন্ড থেকে। টলম্যানের ধারণা হলাে, এই মন্ডটাও অনেকটা সেই কাগজের মডের মত এবং এই মন্ড থেকেও কাগজ তৈরি সম্ভব।


উত্তেজনায় যে কাঁপতে লাগলেন ট্রিলঘুম্যান। ডাকলেন ভাই রিচার্ডকে, খুলে বললেন সব কথা। অবশেষে বললেন, যদি নরম কাঠের কুচিকে এইভাবে মন্ড তৈরি করে নেওয়া যায় তাহলে খুব কম দামে কাগজ বাজারে ছাড়তে পারা যাবে। লাভ ও হবে প্রচুর। এবার দু-ভাই লেগে গেলেন পরীক্ষা নিরীক্ষা করতে। সেই সালফিউরাস অ্যাসিডের সাথে চুন মিশিয়ে নরম নরম কাঠের টুকরো ফেললেন। কাঠ গলে গিয়ে মন্ডের আকার ধারণ করলাে। এবার মন্ডটাকে পরিষ্কার করতে গরম বাষ্প পাঠালেন এবং অতিরিক্ত অ্যাসিডকে বার করে আনতে পানিতে ধৌত করলেন। মন্ডটি তেমনই থেকে গেল এবং পরিষ্কারও হলাে।


এবার মন্ড থেকে কাগজ তৈরির পালা। দুভাই বুদ্ধি খাটিয়ে একটা যন্ত্র এবং ভারি একটা রােলার তৈরি করে নিলেন। তারপর রােলারের তলায় মন্ডটা রেখে যন্ত্রের সাহায্যে রােলার ঘােরালেন।


ট্রিলঘুম্যানের আশা পূর্ণ হলাে। তৈরি হলাে আধুনিক কাগজ এবং একই সঙ্গে প্রচুর পরিমাণে। সভ্যতার এক নব যুগেরও সুচনা হলাে ট্রিলঘুম্যানের হাতে। কাচের পাত্র ক্ষয়ে যায় বলে পরের দিকে ওঁরাই সিমেন্টের পাত্র গ্রহণ করেছিলেন এবং আরও বহুজনের ও বহু ব্যবসায়ী সংস্থার হাতে পড়ে বিভিন্ন কাজের উপযােগী নানা ধরণের কাগজ তৈরি হয়েছে।

Post a Comment

Previous Post Next Post