নীল রঙ(The color blue)কি কোনো কিভাবে আবিষ্কার হলো।

 নীল রঙ


রঙের নেশা মানুষের যেন চিরন্তন। যেদিন মানুষ বনে বনে বিচরণ করতাে, পশুচর্ম পরিধান করতাে, কাঁচা মাংস খেতাে, সেদিনও সে অঙ্গের শােভাবর্ধন করানাের জন্য গায়ে রঙ মাখতাে। মানুষ যেদিন কাপড় বুনতে শিখেছিল, সেইদিন থেকে কাপড়কে আরও জমকালাে করার জন্য খুঁজেছিল প্রাকৃতিক রঙ। খুঁজতে খুঁজতে হয়ত পেয়েছিল মঞ্জিষ্ঠা নামে এক ধরনের লতানাে গাছ। যার. শেকড় থেকে লাভ করেছিল সুন্দর হলুদ রঙ। পরে কোন শিল্পী ঐ হলুদ রঙের সঙ্গে ফটকিরি মিশিয়ে লাভ করেছিল চমৎকার লাল রঙ। সম্ভবতঃ মঞ্জিষ্ঠা প্রাচীন ভারতেই ব্যাপকভাবে ব্যবহার করেছিল- সুতীবস্ত্রের রঞ্জক হিসেবে এবং পরের দিকে এর ব্যবহার ছড়িয়ে পড়েছিল মিশরে ও গ্রীসে। রঞ্জেকের জন্য সেকালের সমস্ত সভ্য দেশ মঞ্জিষ্ঠার চাষ করতাে। একরকম উনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগ পর্যন্তও অব্যাহত ছিল মঞ্জিষ্ঠার চাষ। ঐ উনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে যখন কৃত্রিমভাবে তৈরি জৈব যৌগসমূহ একের পর এক আসতে শুরু করে, তখনই কোন কোন রাসায়ন-বিজ্ঞানীর ধারণা হয়, প্রাণীজ এবং উদ্ভিজ্জ পদার্থগুলােকে কৃত্রিমভাবে তৈরি করা অবশ্যই সম্ভব হবে। তাই সেই থেকে জৈব যৌগগুলাের গঠন রহস্য উঘাটনে যত্নবান হয়েছিলেন অনেকে। তাঁদের মধ্যে প্রখ্যাত জামনি রসায়নবিদ হফম্যান ছিলেন অন্যতম। তাঁরই এক তরুণ ছাত্র। পার্কিন একদিন আকস্মিকভাবে সম্পূর্ণ অজৈব পদার্থ থেকে তৈরি করে ফেললেন এক ধরনের রঞ্জক পদার্থ। এবার চারদিকে সাড়া পড়ে গেল। রসায়নবিদদের পূর্ব ধারণা হলাে বদ্ধমূল। অনেকেই বসে গেলেন পরীক্ষানিরীক্ষা করতে। তারই ফলস্বরূপ ১৮৫৯ খ্রীষ্টাব্দে রসায়নবিজ্ঞানী ভেরকুইন কৃত্রিম উপায়ে তৈরি করে ফেললেন আশ্চর্য সুন্দর লাল রঙ ম্যাজেন্টা।



কৃত্রিম রঞ্জক পদার্থ তৈরির ক্ষেত্রে প্রখ্যাত রসায়নবিদ অ্যাডলফ ফন বেয়ারের অবদান সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘকাল ধরে তিনি কৃত্রিমভাবে রঙ উৎপাদনের গবেষণা করছিলেন এবং বহু ছাত্রকে উৎসাহিত করেছিলেন। জার্মানীতে একটা গবেষণাগারও স্থাপন করেছিলেন তিনি। তাঁরই গবেষণাগার থেকে লিবারম্যান এবং কার্লগ্রীব নামে দুজন রসায়নবিজ্ঞানী সর্বপ্রথম অ্যালিজারিন অণুর গঠন সঠিকভাবে নির্ণয় করেন। অ্যালিজারিন সেই লতানে গাছ-মঞ্জিষ্ঠার শেকড়ের রাসায়নিক উপাদান। বাজারে এর চাহিদা যথেষ্ট ছিল। বলে অনেকেই এ বিষয়ে গবেষণা করছিলেন। কার্লগ্রীব ও লিবারম্যানের গবেষণা এবার অ্যালিজারিন প্রস্তুতির ক্ষেত্রে নতুন সম্ভাবনার দিক উদঘাটিত করলাে। সংশ্লেষণী পদ্ধতিতে তৈরি করার একটা উপায়ও আবিষ্কৃত হলাে। কিন্তু তৈরি করতে গিয়ে বিজ্ঞানীরা দেখলেন, বাজারে প্রচলিত অ্যালিজারিন থেকে এর দাম পড়লাে অনেক- অনেক বেশী। কিছুতেই প্রতিযােগিতা করা গেল না। বাধ্য হয়ে অন্য উপায় চিন্তা করতে হলাে। কিন্তু খুব বেশীদিন অপেক্ষা করতে হলাে না। সেই কার্ডগ্রীব এবং লিবারম্যান অপর এক সহজতম উপায় উদ্ভাবন করলেন। দেখা গেল, এই উপায়ে অ্যালিজারিন তৈরি করতে খরচ পড়লাে অনেক কম। ১৮৭১ সালে তারা এই রঙ বাজারে ছাড়লেন এবং গুণগত বৈশিষ্ট্য ও অল্প দামের জন্য সঙ্গে সঙ্গে বাজার মাৎ করে দিল। পেছু হঠতে বাধ্য হলো মঞ্জিষ্ঠা। অতি অল্পদিনের ভেতরে ওর চাষ একেবারে বন্ধ হয়ে গেল।

Post a Comment

Previous Post Next Post